সামনে আরো কত কী অপেক্ষা করছে!

করোনা ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব আজ টালমাটাল।করোনা ক্রমশ প্রসারণ করছে তার মৃত্যুছোবল। সোমবার (৬ এপ্রিল ২০২০) করোনা কেড়ে নিল দুদক পরিচালক জালাল সাইফুর রহমানকে। জানি না আমাদের সবার সামনে আরো কত কী অপেক্ষা করছে! এ বিষয়ে লিখেছেন মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ

আমি ওকে চঞ্চল নামেই চিনি। ফলে সকালে যখন প্রথম শুনলাম দুদক পরিচালক জালাল সাইফুর রহমান করোনায় মারা গেছে বুঝতে পারছিলাম না কোনজন। গত কয়েক মাস ধরে কাজের সূত্রে প্রায়ই দুদকে যেতাম। দুদকের ডিজি সাহেব একদিন তাকে পরিচয় করিয়ে দিলে দুজনই মূদু হেসেছিলাম। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ও ছিল আমার পরের ব্যাচের বন্ধুসম ছোট ভাই। আমরা অনেক আগে থেকেই পূর্বপরিচিত। পরে পত্রিকায় ছবি ও নিউজ দেখে চমকে উঠলাম। এ তো চঞ্চল! এই প্রথম খুব পরিচিত কাউকে করোনার মৃত্যুর মিছিলে শরিক হতে দেখলাম। শুধু একজন ভালো মানুষকে আমরা হারালাম না, একই সাথে হারালাম একজন সৎ, মেধাবী, বন্ধুবৎসল সম্ভাবনাময় একজন সরকারি কর্মকর্তাকে। যেদিন সাবেক মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ ধরণী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন, সেদিন রাতে তাকে নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট লিখেছিল চঞ্চল। ওর লেখাটি আজ ওকেই নিবেদন করছি−
“তোমার অকাল বিদায় মেনে নেবার নয়। মেনে নিতে পারবে না এদেশের কোনো মানুষ। মেনে নিতে না পারা এই মানুষগুলোর কোনো দল নেই। এরা শুধুই মানুষ। বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। তোমার মতো মানুষের বিদায়ে তাদের চোখে সত্যিই জল পড়ে। এ জলের ফোঁটায় কোনো মিথ্যা, লোক দেখানো কিছু নেই। ভালো থেকো ওপারে আমাদের অপার ভালোবাসা আর দোয়াকে সংগী করে।”
বন্ধুরা সবাই ওর অসুস্থ স্ত্রী ও ছেলের জন্য দোয়া করবেন। সত্যিই জানি না আমাদের সবার সামনে আরো কত কী অপেক্ষা করছে!

করোনা নিয়েও আঁতলামি
করোনা ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব আজ টালমাটাল। বড় বড় শক্তিধর, মহাপরাক্রমশালী রাষ্ট্রও যখন নাকানি চুবানি খাচ্ছে অদৃশ্য এক ক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে; খুঁজে পাচ্ছে না কোনো উৎস, প্রতিকার, সমাধান; বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর মিছিল দিন দিন শুধু বড়ই হচ্ছে−তখনও সর্বত্র আমাদের আবাল কিছু আঁতেলের আঁতলামি দেখতে দেখতে কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম হয়েছে। টেলিভিশন খুললে তারা, ফেসবুক খুললে সেখানেও একদলের অতি আঁতলামোপনা, যে কেউ তাদের কর্মজীবনেও এদের নিত্য উপস্থিতি দেখতে পাবে! যদিও সংখ্যায় এরা একেবারেই নগণ্য, কিন্তু জ্ঞানের বায়বীয় ঝরনাধারায় তারা অনেককে মোহাবিষ্ট করতে দারুণ পারদর্শী। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই ধারণা নেই বেশিরভাগ দর্শক-শ্রোতাই তাদের ওপর মহাবিরক্ত। তাই এই বয়সে এসে তাদেরকে বোঝার জন্য আজ কিছুটা লেখাপড়া করলাম!


যা জানলাম তা হলো আঁতেল শব্দটি আধুনিক বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত একটি ফরাসি শব্দ তেঁলেক্তুয়াল (intellectual)-এর অপভ্রংশ−যা বাংলা ব্যাকরণের বিশেষ্য ও বিশেষণবাচক শব্দ “বুদ্ধিজীবী” বা ইংরেজি ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ শব্দের সমার্থক। আভিধানিক অর্থে আঁতেল হলো পণ্ডিত, বিদ্বান, বুদ্ধিজীবীর ধরন ধারণবিশিষ্ট (ব্যক্তি)। কিন্তু ব্যঙ্গাত্মক মহিমায় একে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিমায় বলা হয়েছে−”পুঁথিগত বিদ্যা আর বাখোয়াজপনায় পারদর্শী, তবে বাস্তববুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞানের অভাবসম্পন্ন এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে আঁতেল নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে−’যে বাস্তব অর্থে জ্ঞানী না হয়েও জ্ঞানীর ভান করে এবং অন্য সকলকে মূর্খ, কপর্দকহীন ভেবে কথা বলে, তাকেও আঁতেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং তিনি যা করেন সেই ক্রিয়াকলাপই হলো আঁতলামি।
ভাষাতত্ত্ববিদ পবিত্র সরকারের একটি লেখা থেকে জানা যায়, “চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী বাঙালির আত্মপ্রকাশ ঘটে, যারা নিয়মিত কফি হাউসে বসতেন, ফতুয়া-পাঞ্জাবি পরতেন, অন্যসকলকে হেয় প্রতিপন্ন করে সারাক্ষন তাদের মধ্যে কথার আদান-প্রদান করতেন ও নিজেদের সেরা মনে করতেন। এসব বুদ্ধিজীবীকে দেখেই অন্যদের বিদ্রূপ এবং প্রতিক্রিয়ার ফল হিসাবে ‘আঁতেল’ শব্দটির প্রয়োগ বিস্তৃত লাভ করতে থাকে।”
ভয়াবহ অদৃশ্য এক মরণঘাতী ভাইরাস করোনার সাথে বিশ্বের তাবৎ মানুষের এক অসম ভয়াবহ বাঁচা-মরার যুদ্ধকালীন এই দুঃসময়েও গণমাধ্যমসহ সবখানে এসব অধম আঁতেল বুদ্ধিপাপীদের উপস্থিতি ও বাখোয়াজপনা তো কমেইনি, বরং একেকজন একেকরকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে পাণ্ডিত্য জাহির করে সাধারণ জনগণকে আরো উদ্বিগ্নতার মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন। সর্বজ্ঞানী এসব জ্ঞানপাপীকে এক্ষুনি ঝেঁটিয়ে বিদায় না করলে আরো বড় কোনো সর্বনাশের জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে!