বাংলাদেশি-ব্রিটিশ ডা. রাহাত সংবাদের শিরোনাম

বাংলাদেশি-ব্রিটিশ ডা. গোলাম রাহাত খান। ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে কর্মরত ডা. রাহাতের এখনকার দায়িত্ব কোভিড-১৯ রোগীদের ইমার্জেন্সি মেডিসিন বিভাগের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ)। বিবিসিসহ ইংল্যান্ডের গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
ইংল্যান্ডের করোনা ভাইরাস মহামারীকালে সামনে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। একদিন পর পর টানা ১২ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয় কোভিড-১৯ রোগীদের আইসিইউতে।
ডা. গোলাম রাহাত খান ১৯৯১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হয়েছিলেন বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে। ২০০০ সালে এমবিবিএস ও ইন্টার্নি শেষ করে দেশে কয়েক বছর ডাক্তারি করেন। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডে চলে যান এই বাংলাদেশি-ব্রিটিশ ডা. রাহাত। ২০০৯ সাল থেকে ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে কাজ করছেন। ডা. রাহাতের পৈতৃক বাড়ি বরিশালের ঝালকাঠি জেলার ধামসিঁড়ি ইউনিয়নে। বাবার কর্মসূত্রে বেড়ে উঠেছেন ঢাকার মতিঝিল এলাকায়। এখন কাজ করছেন ইংল্যান্ডের বার্টস হেলথ অ্যান্ড এইচ এস ট্রাস্ট হসপিটালে।


এই করোনাকালে ব্যথিত হৃদয়ে দূর থেকে বাংলাদেশকে দেখছেন, বাংলাদেশের ডাক্তারদের দেখছেন।
‘আমাদের দায়িত্ব পালনে ঝুঁকি আছে। নিজেদের রক্ষা করেই দায়িত্ব পালন করছি। একটি সাক্ষাৎকারে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই যে করোনা রোগীদের মাঝে যান, ভয় করে না? উত্তরে বলেছিলাম, সৈনিক যুদ্ধে যাওয়ার সময় কি বলে অস্ত্র-গুলি নেই, যুদ্ধে যাব না? একথা দিয়ে এমন কিছু বোঝাতে চাইনি যে, পিপিই ছাড়াই কোভিড-১৯ রোগীদের সেবা করছি। নিজেদের রক্ষা করেই দায়িত্ব পালন করছি। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে সারা পৃথিবীতেই একটা সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা কিন্তু পিপিই ব্যবহার করছি। এন৯৫ মাস্ক ব্যবহার করছি। একবার ব্যবহার করে ফেলে দিচ্ছি,’ বলছিলেন বাংলাদেশি-ব্রিটিশ ডাক্তার রাহাত।
পিপিই কি রি-ইউজেবল হয় না?
‘আমাদের এখানে রিইউজেবল পিপিই বলতে কিছু নেই। একটি পিপিই একবার ব্যবহার করা যায়। কারণ পিপিই পরে যখন কোভিড-১৯ রোগী দেখছেন, তখন পিপিইতে করোনা ভাইরাস লেগে যাচ্ছে। সেটা খুলে রাখবেন, তারপর আবার ব্যবহার করবেন—এতে তো আপনি আক্রান্ত হয়ে যাবেন। আমরা কোনো পিপিই দ্বিতীয়বার ব্যবহার করি না।’
ইউরোপে করোনা ভাইরাস এত ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণ কী। কেন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না?
‘ইতালিতে করোনা ভাইরাস প্রথম ছড়ায়। সেখান থেকে ইংল্যান্ডে আসে। প্রথমাবস্থায় সুপ্ত ছিল, দৃশ্যমান হয়নি। ফলে ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারেনি। ইংল্যান্ডে মার্চের ৩ তারিখে দুই জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়, ১০ তারিখে শনাক্ত হয় আট-নয় জন। তারপর অবিশ্বাস্য গতিতে সংখ্যা বেড়েছে। ইংল্যান্ডসহ ইউরোপ অনুধাবন করতে পারেনি যে, করোনা ভাইরাস দ্বারা তারা এত ভয়াবহভাবে আক্রান্ত হতে পারে। তাছাড়া চীন যে তথ্য জানিয়েছে তা থেকেও ইউরোপ বিভ্রান্ত হয়েছে। চীন ভয়াবহতা ও মৃত্যুর সংখ্যার সঠিক তো জানায়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। করোনা ভাইরাস ছয় সপ্তাহ তাণ্ডব চালিয়েছে চীনে। এতে মাত্র সাড়ে তিন হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করেছে চীন। এসব তথ্যই গণমাধ্যম প্রচার করেছে।’
আপনারা যেসব কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা করছেন, তার মূল সমস্যাটা কী? ডাক্তারদের চ্যালেঞ্জটা কী, কেন এত ডাক্তার মারা যাচ্ছেন?
‘আমরা কোভিড-১৯ আক্রান্ত সবচেয়ে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা করে থাকি। মেডিক্যাল টার্ম বাদ দিয়ে আমি যদি সাধারণভাবে বলি, যাদের ফুসফুস বা লাঙ্গ এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে—একেবারে ঝাঁজরা হয়ে গেছে। এসব রোগীকে তিন থেকে চার সপ্তাহ ভেন্টিলেটরে রাখি। আর্টিফিশিয়ালি ফুসফুসকে কাজ করানো, ব্লাড প্রেশার ঠিক রাখা, কিডনি ফাংশন ঠিক রাখা হয়। এটা ইন্টেনসিভ কেয়ারের রোগীদের কথা বলছি। আইসিইউতে একজন রোগীর গলার ভেতরে যখন একটি নল ঢোকাতে হয় এটাকে বলে অ্যারোসল জেনারেটিং প্রসিডিউর, তখন নলের মধ্য দিয়ে ভাইরাস ডাক্তারের শরীরে আসতে পারে। সামান্য স্পর্শ লেগে গেলে ডাক্তারদের আক্রান্তের আশঙ্কা থাকে।
তবে কোভিড-১৯ সাধারণ রোগীদের ক্ষেত্রে ডাক্তারদের তেমন কিছু করার নেই, দরকারও হয় না। আইসোলেশনে ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে ভালো হয়ে যান তারা।‘
বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনুমান করা খুব কঠিন। প্রতিদিন সংখ্যা বাড়ছে। আরও বেশি পরীক্ষা করলে সংখ্যা আরও বাড়বে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। কিছুটা আশার কথা হচ্ছে, মার্চের ২ তারিখে ইংল্যান্ডে প্রথম শনাক্ত এবং আজকে এপ্রিলের ১৮ তারিখ, এই ছয় সপ্তাহে যেভাবে দানবীয় আকারে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে, ১৪-১৫ হাজার মানুষ মারা গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত তেমনটা দৃশ্যমান হয়নি। হবে না তা যদিও বলা যায় না। সত্যি যদি তেমন হয়, বাংলাদেশের যে সক্ষমতা-অব্যবস্থাপনা তা দিয়ে কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব? সে কথা ভাবলেই আঁতকে উঠতে হয়। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া আর তো কিছু করার দেখছি না।’
ইংল্যান্ড বা ইউরোপ সম্পর্কে সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ কী?
‘ইংল্যান্ডে গত তিন দিনে আমাদের হাসপাতালে নতুন রোগীর সংখ্যা কমছে। যদিও মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি। তবুও এটা ভালো চিত্রের ইঙ্গিত। কারণ মারা যাচ্ছে পূর্বে আক্রান্ত হওয়া রোগী। নতুন রোগী বাড়ছে না। একই চিত্র ইতালি, স্পেনের ক্ষেত্রেও। ধারণা করছি, ইউরোপ পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারছে।’— বলছিলেন বাংলাদেশি-ব্রিটিশ ডা. গোলাম রাহাত খান।