সান্তিয়াগো বার্নাব্যু বদলে দেন রিয়ালের ইতিহাস

১৯৫৩ সালে রিয়াল মাদিদের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো বার্নাব্যু মাত্র ৩ জন খেলোয়াড় আনেন। ২৭ বছরের আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড স্টেফানোকে কেনেন রিভার প্লেট/মিলানিউয়ার থেকে, ১৯ বছরের স্প্যানিশ উইঙ্গার গেন্তোকে কেনেন রেসিং সান্তাদার থেকে আর মালাগা থেকে আনেন বেকারিলকে। আর তাতেই ইতিহাস বদলে যায় মাদ্রিদের। সান্তিয়াগো বার্নাব্যু আর স্টেফানো—এই দুজনের কোনো একজন না থাকলে রিয়াল মাদ্রিদ হয়তো এখন বিলবাও-ভ্যালেন্সিয়ার মতো মধ্যম সারির দল হয়ে থাকত। মাদ্রিদের হয়ে স্টেফানো ২৮২ ম্যাচে ২১৬ গোল করেছেন। এই ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার মানুষটা মাদ্রিদকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখান থেকে খালি নিচেই দেখা যায়, এর উপরে আর যাওয়া যায় না

১৯২৮-১৯২৯ সালে শুরু হওয়া লা লিগার পয়েন্ট সিস্টেম ছিল অদ্ভুত। ম্যাচ জিতলে ২ পয়েন্ট আর ড্র করলে ১ পয়েন্ট যোগ হতো। হেরে গেলে ২ আর ড্র করলে ১ পয়েন্ট মাইনাস হতো। উইকি বা অন্য জায়গাতে এখনকার ফরমেটে দেওয়া আছে বোঝানোর সুবিধার জন্য। প্রথম মৌসুমে বার্সেলোনা ২৫-১১তে চ্যাম্পিয়ন হয় (১১টাতে জয়ী, ৩টা ড্র আর ৪টা হার)। আর রিয়াল মাদ্রিদ ২৩-১৩তে রানারআপ হয় (১১টাতে জয়ী, ১টা ড্র আর ৬টা হার )। রিয়াল প্রথম লা লিগা জেতে ৩১-৩২ সালে। ২য় বার জেতে ৩২-৩৩ সালে। এর পর ২০ বছর আর লা লিগা জেতেনি। ১৯৫৩ পর্যন্ত শিরোপা ছিল যথাক্রমে বার্সেলোনা (৬), বিলবাও (৫), ভ্যালেন্সিয়া (৩), অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ (২), অ্যাটলেটিক এভিয়েশন (২), রিয়াল মাদ্রিদ (২), সেভিয়া (১) আর রিয়াল বেটিস (১)। লা লিগা ১৯৫১তে রিয়াল মাদ্রিদ ছিল ৯ নম্বর, ১৯৫২ আর ১৯৫৩তে দুবারই ৩ নম্বর হয়েছিল।


১৯৫৩ সালে প্রেসিডেন্ট বার্নাব্যু মাদ্রিদে মাত্র ৩ জন খেলোয়াড় আনেন। ২৭ বছরের আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে কেনেন রিভার প্লেট/মিলানিউয়ার থেকে, ১৯ বছরের স্প্যানিশ উইঙ্গার গেন্তোকে কেনেন রেসিং সান্তাদার থেকে আর মালাগা থেকে আনেন বেকারিলকে। আর তাতেই ইতিহাস বদলে যায় মাদ্রিদের। স্টেফানো ১৩ বছর মাদ্রিদে ছিলেন, মানে নিজের ৩৯ বছর বয়স পর্যন্ত। এই সময়ে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত লা লিগার টপ স্কোরার ছিলেন স্টেফানো। এই ১৩ বছরে লা লিগা জেতেন ৮ বার। আর গেন্তো ১৮ বছর মাদ্রিদে থেকে জেতেন রেকর্ড ১২ লা লিগা। এই ১৯৫৩ থেকে ১৯৭৩ এই ২০ বছরের মধ্যে বিলবাও ১ বার (১৯৫৬), অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ৩ বার (১৯৬৬, ১৯৭০, ১৯৭৩), বার্সা ২ বার (১৯৫৯, ১৯৬০) জেতে, ভ্যালেন্সিয়া ১ বার (১৯৭২) লা লিগার শিরোপা জেতে। বাকি ১৩ বার রিয়াল মাদ্রিদ লা লিগা জিতে অন্য সব স্প্যানিশ ক্লাব থেকে কয়েক যুগ এগিয়ে যায়।


স্টেফানো-পুসকাস এর পরেই ইয়ো ইয়ো জেনারেশন মাদ্রিদ ল্যাগিসি ধরেছিল যারা সব সময় টিম হয়ে খেলত।এদের মধ্যে গেন্তো ছাড়া খুব বড় কোনো স্টার ছিল না। ইয়ো ইয়োর পরে এসেছিল ‘Vulture’s Cohort’ বা লা কুয়িন্তে জেনারেশন, এদের অধিকাংশই ক্যাস্টিয়া প্রোডাক্ট। যাদের ইমোশন রিয়াল মাদ্রিদকে করেছিল শক্তিশালী। বুত্রায়িয়েনের লিডারশিপে হুগো সানচেজ, মিচেল, সানচিস, চেন্দোরা টানা ৫টা লা লিগা শিরোপা এনে দিয়ে মাদ্রিদকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। কার্যত লা কুয়িন্তে জেনারেশনের পর মাদ্রিদ হোঁচট খায়। ১৯৯১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত লা লিগাতে একচ্ছত্র আধিপত্য করতে পারছে না। এই ২৭ বছরে মাত্র ৮ বার লা লিগার শিরোপা জয় করেছে মাদ্রিদ, যেটা তার নামের সাথে বেমানান। ইতিহাস বলে লা লিগা আর চ্যাম্পিয়নস লিগ এ দুটিতে একসাথে সফল হওয়ার রেট কম। স্টেফানোর সময় ছাড়া লা লিগাতে ডমিনেট আর চ্যাম্পিয়নস লিগ ধরে রাখতে পারেনি। ইয়ো ইয়ো জেনারেশনরা সেই অর্থে সফল হতে পারেনি চ্যাম্পিয়নস লিগে।


লা কুয়িন্তে জেনারেশন লা লিগায় দাপট দেখালেও মার খেয়েছে চ্যাম্পিয়নস লিগে। এমনকি সেই সময়ে দুটো ইউরোপা লিগ জিতে বুঝিয়ে দিয়েছে আমরা ইউরোপ ডমিনেট করার মতো শেপ থেকে বহু দূরে। এর পর মাদ্রিদ হোমগ্রোন প্লেয়ার প্রজেক্ট বাদ দিয়ে স্টার প্লেয়ার কেনার প্রজেক্টে যায়, যেখানে রিয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়নস লিগে মোটামুটি ডমিনেট করলেও লা লিগাতে ব্যর্থই বলা যায়।
মাদ্রিদের অতীত ইতিহাস নিয়ে আমরা এত যে গর্ব করি তার একমাত্র কারণ এই, ১৯৫৩-১৯৭০ সালের ম্যানেজমেন্ট আর প্লেয়ার। আর সংক্ষেপে বললে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু আর স্টেফানো; এই দুজনের কোনো একজন না থাকলে আমরা হয়তো বিলবাও-ভ্যালেন্সিয়ার মতো মধ্যম সারির দল হয়ে থাকতাম। মাদ্রিদের হয়ে স্টেফানো ২৮২ ম্যাচে ২১৬ গোল করেছেন। এই ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার মানুষটা মাদ্রিদকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখান থেকে খালি নিচেই দেখা যায়, এর উপরে আর যাওয়া যায় না।