শিশুর হাতে ইন্টারনেট : সচেতন থাকুন

প্রযুক্তির অত্যধিক ব্যবহার শিশুর মানসিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে রঙিন ডিজিটাল দুনিয়ায় অধিকাংশ সময় কাটানোর ফলে বাস্তবজগৎ শিশুদের কাছে অত্যন্ত সাদামাটা হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেট তথা ডিজিটাল ভূত এমনভাবে সওয়ার হয়েছে যে দিনের প্রায় ২৪ ঘণ্টাই শিশুরা গেম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকছে। ডিভাইসের ওভার-এক্সপোজারের ফলে অনেক মা-বাবাই আজকাল যোগাযোগের দুর্বলতা এবং কথা বলতে সমস্যায় পড়ছেন। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীও আজকাল স্মার্টফোন ও ল্যাপটপে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ছে। সামাজিকীকরণেও অসুবিধা হচ্ছে।


মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগ্রহী এবং বেশ সক্রিয়। বিশ্বব্যাপী শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কতখানি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণা হচ্ছে।
গবেষণায় জানা যাচ্ছে, এই সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার কারণে হতাশা ও বিষণ্ণতার শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আজকাল শিশুরা যে ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে সেগুলোও বেশ উদ্বেগজনক। ফলে সাইবার সুরক্ষা আইন এবং অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বও সামনে চলে আসছে।
ইউনিসেফের মতে, বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে কমপক্ষে ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা, সাইবার বুলিং এবং ডিজিটাল হয়রানির শিকার হয়। প্রাপ্তবয়স্করা যখন এ জাতীয় পরিস্থিতিতে পড়েন, তখন তাদের কাছে ডিজিটাল সুরক্ষা আইন এবং তাদের নিজস্ব অধিকারগুলো সম্পর্কে জানার সুযোগ আসে। কিন্তু, শিশুদের ক্ষেত্রে এমনটি খাটে না। ফলে বাচ্চাদের সাইবার ক্রাইমের শিকার হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি এবং এর ফলে জন্ম নেওয়া ট্রমাও শিশুদের বহু বছর পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়ায়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুরা ইন্টারনেটে কী দেখছে, কী করছে অভিভাবক তা নজরদারিতে রাখেন। এজন্য অনেক মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং সফটওয়্যারও রয়েছে। কিন্তু, এই সফটওয়্যারগুলো কি আদৌ কোনো সাহায্য করে?


অনেকেই যুক্তি দেখান যে, নিষিদ্ধ বিষয়বস্তুর প্রতি শিশুদের আগ্রহ প্রবলভাবে থাকে। তাই নিষেধাজ্ঞা আরোপ অনেক ক্ষেত্রে ভালোর চেয়ে ক্ষতির কারণই বেশি হতে পারে। ক্রমাগত নজরদারি বাচ্চাদের গোপনীয়তাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং এর ফলে শিশু জেদি হয়ে মা-বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে বিকল্প উপায়ে ইন্টারনেটে সময় কাটানো শিখে নেয়।
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO)-এর মতে, তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা উচিত না। কর্মজীবী মা-বাবা, বিশেষ করে যারা কাজ করার সময় বাচ্চাদের ব্যস্ত রাখার প্রয়োজনে বিভিন্ন ডিভাইস বাচ্চাদের হাতে দিয়ে থাকেন, তাদের পক্ষে এ নিয়ম মেনে চলা প্রায় অসম্ভব। যা প্রয়োজন তা হলো নিয়ম ও নিষেধাজ্ঞার ভারসাম্য।
বাচ্চারা যাতে এমনটি না মনে করে যে তাদেরকে অত্যধিক বিধিনিষেধের আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি বাচ্চাদের বিনোদনমূলক ভিডিওর পাশাপাশি শিক্ষামূলক বিভিন্ন কন্টেন্ট দেখার জন্য উৎসাহ দিতে হবে।
আজকাল মা-বাবারা শিশুদের ব্যাপারে অত্যধিক প্রতিরক্ষামূলক এবং উদ্বিগ্ন। বাচ্চারা কান্নাকাটি করলে তারা অনেক সময় ডিভাইস হাতে দিয়ে শান্ত করেন বটে, তবে শিশুরা প্রযুক্তির সংস্পর্শে নেতিবাচক পরিণতির মুখোমুখি হবে এমনটিও তারা চান না। অভিভাবকদের প্রথম ভুল শিশুর অনুরোধ বা কান্নাকাটির জন্য তার হাতে ডিভাইস তুলে দেওয়া।
ইউনিসেফ বাংলাদেশ, গ্রামীণফোন এবং টেলিনর গ্রুপ অনলাইনে নিরাপদে থাকার জন্য দেশের ১ কোটি ২০ লাখের বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পাশাপাশি, এ প্রকল্পটি শিশুদের অনলাইন সুরক্ষার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য চার লাখ পিতামাতা, শিক্ষক ও পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেবে। ‘বাংলাদেশে শিশু অনলাইন সুরক্ষা জোরদার এবং স্কেলিং’ নামের এই প্রকল্পটি দুই কোটি লোকের কাছে পৌঁছে যাবে এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার লোককে সহায়ক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে।
যদিও শিশুদের উপর প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরূপ প্রভাব বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে এ নিয়ে গবেষণায় এখনো ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। কেননা, শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার একটি সাম্প্রতিক ঘটনা এবং এই শিশুদের বেশিরভাগ এখনও বয়ঃসন্ধির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে বা অতিক্রম করতে পারেনি। আর তাই, শৈশবের ডিজিটাল ডিভাইসগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো এখনো অধ্যয়ন করা সম্ভব হয়নি।
শিশুদের প্রাথমিক বিকাশের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির যে নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে তা সর্বজনস্বীকৃত। তাই শিশুর হাতে ইন্টারনেট প্রযুক্তির মতো ব্যাপক জিনিস তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকেই সচেতন হতে হবে।