বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি পেতে যা লাগবে

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি পাওয়ার জন্যে অবশ্য আর-একটা যোগ্যতা লাগবে, সেটি হলো নিজে কিছু লিখতে না-পারা, ফলে, শিশুদের মতো মুখস্থ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। মুখস্থ করার ক্ষমতা যদি সবার সমান হতো তাহলে বাংলা বিভাগ খুব বিপদে পড়ে যেত, কারণ একই নোটে পরীক্ষা দিয়ে সবাই প্রথম শ্রেণি পেত : হুমায়ুন আজাদ

স্রেফ মজা করার জন্যে, তাঁকে রুমে একা পেয়ে বিভাগের শিক্ষকদের সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘আগে ভাবতাম এখানে রেজাল্টের জোরে শিক্ষক হওয়া যায়। এখন দেখছি এর সঙ্গে লবিংও লাগে। এখানে যারা প্রথম শ্রেণি পায়, দেখা গেছে তারা আমার কোর্স নেয়নি। নিলেও ভালো করেনি, কিন্তু অন্য শিক্ষকদের কোর্সগুলোয় এত ভালো নম্বর পেয়েছে, আমার কোর্সে থার্ড ক্লাস পেলেও তাদের সমস্যা নেই। তারা অশুদ্ধ বাক্য লিখলেও অন্য শিক্ষকরা তাদের নম্বর দিতে আনন্দ পান।’
বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়েপ্রথম শ্রেণি পাওয়ার জন্যে অবশ্য আর-একটা যোগ্যতা লাগবে, সেটি হলো নিজে কিছু লিখতে না-পারা, ফলে, শিশুদের মতো মুখস্থ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। মুখস্থ করার ক্ষমতা যদি সবার সমান হতো তাহলে বাংলা বিভাগ খুব বিপদে পড়ে যেত, কারণ একই নোটে পরীক্ষা দিয়ে সবাই প্রথম শ্রেণি পেত।
আরও বললেন, ‘তুমি দেখবে, এই বিভাগে কোনো সৃষ্টিশীল শিক্ষক নেই, যদিও একসময় তাদের কারও-কারও মধ্যে সেই সম্ভাবনা ছিল। এই বিভাগের কোনো শিক্ষকই চিন্তাশীল নন, কারও কোনো প্রশ্ন নেই, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাস্টাররা যেমন হাজিরা দিয়ে ক্লাসরুমে ঢোকেন আর বের হন, এখানকার শিক্ষকরা তেমনই। বছরের পর বছর তারা একই বিষয় পড়ান, একই বক্তৃতা দেন। সৃষ্টিশীল হলে, চিন্তাশীল হলে এমনটি হওয়ার কথা নয়।’


আমি বললাম, ‘আপনার কথা পুরোপুরি মানতে পারছি না। রফিকুল ইসলাম, সৈয়দ আকরম হোসেন তো আছেন। তাঁরা কি কিছুই করেননি?’
তিনি বললেন, ‘তাঁরা দুজনই জনপ্রিয়। দ্বিতীয়জনকে নিয়ে আমার অভিযোগ নেই, আগেরজনের ব্যাপারে আমার কথা হলো ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে উনি যে-কাজ করেছেন তা বেশ গুরত্বপূর্ণ। এ-বিষয়ে আরও কিছু করার সামর্থ্য তাঁর ছিল। কিন্তু তিনি নজরুলের মাজারের খাদেম হয়ে গেছেন।’
এ-সব কথা যিনি বলেন, তিনি আর যা-ই হোন, সহকর্মীদের পছন্দের কেউ হতে পারেন না। তাঁরা যে প্রকাশ্যে তাঁকে নিয়ে গর্ব করতে পারতেন, সেই রাস্তা তিনি দিয়েছিলেন বন্ধ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের বেলায় ব্যাপারটা তেমন না-হলেও, তাঁকে যে খুব পছন্দ তারা করত, এমন বলা যায় না, আমার সময়ে অন্তত তা দেখিনি। কেউ তাঁর কাছ থেকে কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে খুশি হতেন। কারও মধ্যে সম্ভাবনা দেখার পর তার পতন দেখলে তিনি প্রকাশ্যে হতাশা ব্যক্ত করতেন।