বরুণা তোর…

আমার চাচাতো ভাইয়ের খালাতো বোনের ননদের মামাশ্বশুরের মেয়ের নাম বরুণা; সে হিসেবে মেয়েটি আমার খুবই নিকটাত্মীয়! বাবা-মায়ের বিয়ের এক যুগ পর ঘর আলো করে জন্ম নেওয়ায় দাদি তার নাম রাখে ‘রঙিলা’। খুবই সেকেলে। কিন্তু বাড়ির মুরব্বির শখ করে রাখা, কেউ কিছু বলতেও পারছিল না। তখন অবশ্য বুদ্ধির খেলা দেখায় পরিবারের সবচেয়ে অবহেলিত সদস্যটি, কবি অরণ্যদূত (স্বঘোষিত নাম)। বললেন—‘ভাতিজির নাম রাখা হোক বরুণা, যার অর্থ রঙিন। মায়ের দেওয়া নামেরই আধুনিকায়ন।’ তার যুক্তিতে সবাই খুশি। তবে সেই নাম নিয়ে এখন বেশ অস্বস্তিতে বরুণা নিজেই। ছোট চাচুর ওপর সে খুবই বিরক্ত, শুনতে বাজে লাগলেও দাদির দেওয়া নামটা পরিবর্তন করা তার ঠিক হয়নি বলেই মনে করে সে। কেননা পাড়ার বন্ধু-বান্ধবের জ্বালাতন তার আর সহ্য হচ্ছে না। সবাই বলে, ‘বরুণা গো বরুণা, তোর কি হইছে করোনা?’ শিশু-কিশোররা তো আসলে এমনই। আতঙ্কের কোনো বিষয় নিয়েও তারা মেতে ওঠে দুরন্তপনায়। নামের সঙ্গে আলোচিত বিষয়কে টেনে এনে ছন্দ মিলায়। তাই করোনার সঙ্গে বান্ধবী বরুণার নাম মিলিয়ে ছড়া কেটে আনন্দ কুড়ানো। তাদের ধারণাতেও নেই কতটুকু ভয়ঙ্কর কোভিড-১৯। চোখের সামনেই কেড়ে নিতে পারে প্রিয় বন্ধুর প্রাণ।
চীনের সন্তান করোনা ভাইরাস ইতালি হয়ে আমাদের দেশে আসে। গত ৮ মার্চ প্রথম সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্তের ঘোষণা দেয় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর। এর দশ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ প্রথম প্রাণ কাড়ে ভাইরাসটি। সেই থেকেই শুরু। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন, মে পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়াবে। এখন আবার তারাই বলছেন সহজে যাওয়ার নয়, অনেক দিন থাকবে এ অতিথি। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এ জন্য জনগণের অবাধ মেলামেশাকেই দায়ী করছেন। যদিও পরিস্থিতি সামাল দিতে কড়াকড়ির খড়গ নেমেছিল দেশে। অঘোষিত লকডাউন দিয়ে বলা হয়—এ সময়ে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাওয়া যাবে না। কর্মস্থল ত্যাগ করে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া যাবে না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঢাকায় আসতে বা বাইরে যেতে পারবেন না। ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। রাজধানীর প্রবেশপথে তল্লাশি চৌকি বসিয়ে জনগণকে সতর্ক করা হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। নানা অজুহাতে অনেকেই ঢাকা আসেন। আবার ঢাকাও ছাড়েন।
ফেরিঘাটগুলোতে প্রচ- ভিড় দেখে মনে হয়, এ দেশে যেন কিছুই হয়নি। সবই চলছে স্বাভাবিক নিয়মে। তাই করোনার দাপট এখন সব হিসেবনিকেশের বাইরে। প্রতিদিনই শনাক্ত হচ্ছে হাজারে হাজার, দেহে ছেড়ে যাচ্ছে প্রাণ অর্ধশতাধিক। সরকারি হিসাবটা অবশ্য আন্ডারকা ফিফটিন। যদিও বিপুল সংখ্যক মানুষ বরুণার মতোই সামাজিকভাবে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে পরীক্ষা করাতেই যাচ্ছেন না।
মহামারী মানচিত্রে এইডস, ইবোলা, ডেঙ্গু, প্লেগের মতো কোভিড-১৯ ভাইরাসও স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষকরা বলছেন, গত অর্ধশত বছরে দেড় হাজার নতুন প্যাথোজেন আবিষ্কার হয়েছে। ১৯৭৬ সালে ইবোলা ও ১৯৮৩ সালে এইচআইভি যার মধ্যে অন্যতম। এরা এখনো রয়ে গেছে। সময়মতো ছোবল বসায়। শুধু এইডসের কথাই যদি ধরা হয়, মাত্র ৩৭ বছর বয়সেই সাড়ে সাত কোটি মানুষের দেহে অট্টালিকা বানিয়েছে সে। আর প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষকে বিদায় করে দিতে পেরেছে পৃথিবী নামের এ গ্রহ থেকে। তার এমন কর্ম অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ দিনে ৮০ কিশোর-কিশোরীকেও ধরার মায়া ত্যাগ করাতে পারবে বলে অনুমান ইউনিসেফের। আবার প্লেগের সংক্রমণ অতীত, এমনটাই ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বছর তিনেক আগেই ২০১৭ সালে আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কারে প্রায় আড়াই হাজার লোক এতে আক্রান্ত হয়। প্রাণ হারায় দুই শতাধিক। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বিশ্বে ১৭২ দেশকে ইবোলা, কলেরা, চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার, লাসা ফিভার, জিকা, নিপা, মেনিনজাইটিস, সার্সসহ মোট ১৩০৭ বার মহামারীর সম্মুখীন হতে হয়েছে। শুধু কলেরাই ব্যাপক আকারে হানা দিয়েছে ৩০৬ বার। এ ছাড়া জিকা ও মেনিনজাইটিস ছোবল দিয়েছে ১৩৭ বার করে, চিকুনগুনিয়া ৯৫, ওয়েস্ট নাইল ফিভার ৯১, টাইফয়েড ৭৫, লাসা ফিভার ২৩, ইবোলা ২২ বার এবং অন্যান্য ভাইরাসও। এবার যোগ হলো করোনা। ২০০৩ সালের ৫ জুলাই বিশ্বজুড়ে সার্সের সংক্রমণ থামার ঘোষণা দিয়ে হু বলেছিল, এ ভাইরাসটি একটি সতর্কবার্তা। অতিউন্নত স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকেও সার্সের সামনে অসহায় লেগেছে। পরের বার আমরা অতটা সৌভাগ্যবান নাও হতে পারি। সত্যিই যে ‘সৌভাগ্যবান’ হওয়া যায়নি তা এ কয়েক মাসেই প্রমাণ করে দিয়েছে কোভিড-১৯। কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এ সংক্রমণের শেষ কবে। এর মধ্যে আবার দরজায় কড়া নাড়ছে নতুন আতঙ্ক, নতুন ধরনের সোয়াইন ফ্লু। চীনের শূকরের নাকের শ্লেষ্মা থেকে এর খোঁজ পেয়েছেন গবেষকরা। এ ভাইরাসও নাকি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা বিশ্বে।
নানা হিসাব-নিকাশ কষে ব্যবসাটা যে জমবে বেশ, ভালোই বুঝেছেন ‘বণিক সমাজ’। জমির কারবারিও খুলে বসেছেন হাসপাতাল। আমার নাকের শ্লেষ্মা টেনে ভরছে পকেট বেয়াই সাহেবের। মুখে হাসি বুকে বল নিয়ে টাকা গোনেন আর মনের সুখে গেয়ে যান—‘ও তুই, যতই জ্বালা দিস রে কালা,/ততই বাড়ে প্রেমও স্বাদ,/তোর লাইগা বেহায়া মনটা, করে রে উৎপাত…।’ তাদের চিকিৎসা পদ্ধতি, ওষুধ, প্রযুক্তির প্রয়োগ, সংখ্যাতত্ত্বের যথার্থতা, বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস থাকে না জনসাধারণের। নাম বলতেও নিচুটান। সেটা বললে যে চাকরিটাই থাকবে না! মানুষ তাই অপেক্ষায় থাকে—কবে অন্দর থেকেই, মানে মোড়লদের স্বার্থের টানাটানিতে উঠে আসবে সে কথা। বেয়াই তখন ফান্দে পড়া বগার মতো কেঁদে কেঁদে বলবেন— ‘মানুষের তরে মানুষ আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। সেই ব্রত নিয়েই তো মানুষের জন্য বিলিয়ে দিয়েছিলাম নিজের সব। কিন্তু আজ আমি ষড়যন্ত্রের শিকার!’ আহা আহা, আহারে করোনা ঘরে থাকতে দিলি না। কেড়েছিস কত শত ডাক্তার, পুলিশ, সাংবাদিক, নেতা, এমপি, মন্ত্রী, বুদ্ধিজীবী। ভয় দেখিয়ে স্পর্শের বাইরে রেখেছিস শব। তাই দেখে কাতর অন্তর মম গেয়ে ওঠে—‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে/কত প্রাণ হলো বলিদান,/লেখা আছে অশ্রুজলে…।’ এ নোনাজল যে কত দূর গড়াবে কে জানে আজ! এ যেন বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে করোনার বিশ্বাসঘাতকতা। বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনা নীল পদ্মেও তার মন ভরে না। সে যে আসলে প্রাণঘাতক, বুকে তার এখন শুধুই পচা মাংসের গন্ধ!

কেননা পাড়ার বন্ধু-বান্ধবের জ্বালাতন তার আর সহ্য হচ্ছে না। সবাই বলে, ‘বরুণা গো বরুণা, তোর কি হইছে করোনা?’ শিশু-কিশোররা তো আসলে এমনই। আতঙ্কের কোনো বিষয় নিয়েও তারা মেতে ওঠে দুরন্তপনায়।


আমাদের দেশে যে চিকিৎসক তৈরি হচ্ছেন, তা কি চাহিদা মেনে? এ প্রশ্ন রাখার একটা বিশেষ কারণ রয়েছে। কেননা বছরে যত মানুষ অসুস্থ হন, তাদের মাত্র আড়াই শতাংশের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে। বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা পেলেই সেরে যায়, এক সময় সে চাহিদা গৃহ-চিকিৎসকেরা পূরণ করতেন। ফলে ৯৫ শতাংশেরই সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে যাওয়ার দরকার হতো না, যদি স্বাস্থ্যশিক্ষার ফ্যামিলি মেডিসিন শাখাটি আকর্ষণীয় এবং পেশা হিসেবে সম্মানজনক হতো। কিন্তু হবেই বা কী করে, আমাদের সবকিছু যে চলে অর্থের মানদণ্ডে। যত পরিকল্পনা, তাও করেন অর্থনীতিবিদরা। এমনকি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তির মতো মৌলিক বিষয়েও তারা সেরাম বিশেষজ্ঞ; যাকে বলে—সব কাজের কাজি। এসব খাত নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের সঙ্গে আলোচনারও প্রয়োজন মনে করেন না সেই কাজিরা। তাতে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, করোনাকালই তার বাস্তব প্রমাণ। ঠিকমতো প্রটেকশন না দেওয়ায় একের পর এক প্রাণ ঝরছে ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে চিকিৎসকদের মৃত্যুর হার আজ সবচেয়ে বেশি। যে ওষুধ আসার কথা সেটা আসছে না। ভেঙে পড়েছে পুরো স্বাস্থ্য খাত। কোভিড ১৯-এর দোহাই দিয়ে অন্য রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে না। টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ এগিয়ে ছিল, সেটাতেও হয়েছে ব্যাঘাত। তাতে শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার আবারও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা।
চীনের উহানে প্রথম শনাক্ত হওয়ার প্রায় ৬৯টি দিন পর করোনা ভাইরাস আমাদের দেশে অতিথির বেশে ঢোকে। তার আগে আমরা নাকে তেল দিয়ে বেশ ভালোই ঘুমাচ্ছিলাম। ‘সুড়সুড়ি’ দিয়ে কেউ ঘুম ভাঙালে বলেছিÑ ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে, সময়েই সব দেখতে পারবেন। আর ঘুমের ডিস্টার্ব করবেন না। এখন আপনিও নাক ডেকে ঘুমান। দরকার হলে একটা সরিষার তেলের বোতল নিয়ে যান। আমার কাছ ঢের আছে!’ আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা… ছড়া কাটতে কাটতে আবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সেই ঘুম যখন ভাঙল, তখন পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। তখনো দেখা গেল অনেকে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে ক্ষণিকের জন্য হিরো সেজেছেন মুক্ত মাধ্যমে। কোনোটাই ধোপে টেকেনি। কেউ কেউ বলেছিলেন—কোভিড-১৯ নাম হলেও এর আচরণ হবে টি-২০ ক্রিকেটের মতো। কালবৈশাখীর মতো এসে চলে যাবে সে মতোই। কিন্তু সে ধারণাও আজ মিথ্যা প্রমাণিত। বৈশাখী ঝড়ের মতো এসে গোটা বিশ্বকে তছনছ করে দিয়েও প্রলয়নাচন থামেনি। এ যেন অন্তহীন এক নিঠুর খেলা। আর এ খেলায় আমাদের প্রস্তুতি যে কতটুকু ছিল, তা সময়ই বলে দিল।
হারানো সময় বলে কি আলাদা করে কিছু হয়? সে তো আসলে অনেকগুলো মুহূর্তের ভেতর দিয়ে ছুটে চলে। আর মুহূর্তগুলোর মৃত্যু ঘটে সেই মুহূর্তেই। তাই সময় চিরকালই একটা হারিয়ে যাওয়া ব্যাপার। যেন চলন্ত ট্রেনের জানলার কাচ ফুঁড়ে দেখা বাস্তবতা, বাস্তবতার কুহক। নিমেষ নিহত একটি দৃশ্য বা ঘটনার স্মৃতিতে গিয়ে জমা হওয়ার অবিরল প্রক্রিয়াই সময়ের প্রবহমানতা। তবে আমাদের সমাজে যেন সময়টাকে বেঁধে রাখাই নিয়ম, যা শুরু হয়েও হতে চায় না শেষ। হয়তো করোনারাও আমাদের সময়ের ট্রেনে চেপে বসেছে। পদ্ম-মেঘনা-যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা—স্লোগান তুলে বঙ্গে ঘাঁটি গাড়তে চায় এই চৈনিক সন্তান। যেমনটা এইডস কিংবা ডেঙ্গু এরই মধ্যে পোক্ত করেছে। হয়তো একদিন করোনাকে করুণা করে জাতীয় রোগ বলে গলা ফাটাবে আমাদেরই উত্তর প্রজন্ম!