তিন নেতার মাজারে কিছুক্ষণ

তিন নেতার মাজারের পাশে গিয়ে অনেকেই থমকে দাঁড়ান এর স্থাপত্যরীতির চমৎকারিত্ব দেখে। এখানে শায়িত আছেন স্বাধীনতা-পূর্ব অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের তিন বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা—শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমুদ্দিন । তৎকালীন রাজনীতিতে এই তিন নেতার অবদান অবিস্মরণীয়। বিশেষ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় এদের ছিল বিশেষ ভূমিকা। তবে তিন নেতার তৃতীয়জন (খাজা নাজিমুদ্দিন) বাঙালি হয়েও নানা কারণে বাঙালি মহলে অজনপ্রিয় ছিলেন।

আবুল কাশেম ফজলুল হক রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের কাছে ‘শেরেবাংলা’ এবং ‘হক সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি কলকাতার মেয়র, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। যুক্তফ্রন্ট গঠনে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। ১৯৬২ সালে ২৭ এপ্রিল এই মহান নেতা ঢাকায় মারা যান।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বিখ্যাত রাজনীতিক ও আইনজীবী। তিনি রাজনৈতিক জীবনে কলকাতা করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র, ফজলুল হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার শ্রম ও বাণিজ্য মন্ত্রী, খাজা নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভায় বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী, অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রী এবং পাকিস্তানে পঞ্চম প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। গণতান্ত্রিক রীতি এবং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার কারণে তাকে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। বরেণ্য এ নেতা ১৯৬৩ সালে ৫ ডিসেম্বর লেবাননের রাজধানী বৈরুতের একটি হোটেল কক্ষে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাঙালি রাজনীতিক খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সদস্য হিসেবে নাজিমুদ্দিন ব্রিটিশ আমলে দুইবার বাংলার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর তিনি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হন। ১৯৫১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। নানা কারণে তিনি বাঙালি হয়েও বাঙালি মহলে অজনপ্রিয় ছিলেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৬৪ সালের ২২ অক্টোবর তিনি মারা যান।
তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সাধারণের স্বার্থবিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের পরও এ কে ফজলুল হক এবং সোহরাওয়ার্দীর পাশে তাকে সমাহিত করা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
তিন নেতার মধ্যে প্রথম মৃত্যুবরণ করেন এ কে ফজলুল হক। তাকেই প্রথম সমাহিত করা হয় এখানে। তিন নেতার তিনজন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মারা গেলেও তাদের কবর দেওয়া হয়েছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একই জায়গায়। এটি মূলত মুসলিম স্থাপত্যরীতির স্থাপত্যিক ভাস্কর্য। এটি ঢাকার অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন। মাজারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দোয়েল চত্বরের উত্তর দিকে অবস্থিত।
তবে এ স্থাপত্যকলার বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, এখানে কারা চিরনিদ্রায় রয়েছেন। জানা না থাকলে হঠাৎ করে দেখে পথচারীদের এটি বোঝারও কোনো উপায় নেই। যে কারণে ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে স্থাপিত হলেও এখানে সমাহিত নেতাদের নাম নিয়ে ভুল ধারণা রয়েছে অনেকের। যারা জানেন না, তাদের কাছে অজানাই থেকে যাচ্ছে। বাইরে থেকে দেখা যায় সেভাবে এই তিন নেতার নামফলক দিলে পথচারীদের চোখে পড়বে।